September 27, 2022
শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান বই রিভিউ

শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান বই রিভিউ

শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান বই রিভিউ আজকের নিবন্ধের মূল লক্ষ্য। যারা বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের বাংলা উপন্যাস পড়েছেন; তারা সবাই চিনেন বাংলা আধুনিক সাহিত্যের একটি ঝড়ে পড়া নক্ষত্র হলেন জহির রায়হান। জহির রায়হানের শেষ বিকেলের মেয়ে একটি রোমান্টিক উপন্যাস। আর, তার অন্যান্য উপন্যাসের মত এই উপন্যাসটিও তার চলচ্চিত্রিত উপন্যাস

শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান বই রিভিউ

শেষ বিকেলের মেয়ে- জহির রায়হানের এই উপন্যাসটি রিভিউ করতে গেলে প্রথমে এর লেখক ওর তারপর এই উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত কাহিনী জানা প্রয়োজন। এইখানে প্রথমে আমরা উপন্যাসের লেখক সম্বন্ধে কিছু কথা জেনে নিবো। তারপরই আমরা উপন্যাসটি পাঠ পরবর্তী পর্যালোচনা করবো।

জহির রায়হান সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ প্রথমেই বলি জহির রায়হান বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট মাসে জন্মগ্রহন করেন এবং মৃত্যু হয় ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মাসে তার নিখোঁজ জ্যেষ্ঠ ভাই শহিদুল্লাহ কাইসারকে খুঁজতে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। বাংলা সাহিত্যের গল্প শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য তাকে ১৯৭২ সালে মরণোত্তর বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

এরপর, ১৯৭৫ সালে তাকে বাংলা চলচ্চিত্রে সামগ্রিক অবদানের জন্য তাকে ১ম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়।    আর সর্বশেষ ১৯৯২ সালে তাকে আবার মরণোত্তর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বাধীনতা পুরষ্কারে ভূষিত হন। “শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান রচিত প্রথম উপন্যাস। তার এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় প্রথম ১৯৬০ সালে।

তার রচিত অন্যান্য উপন্যাস গুলো হল হাজার বছর ধরেআরেক ফাল্গুন। তার রচিত হাজার বছর ধরে উপন্যাসটি ১৬৬৪ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করে। তো এই ছিল লেখক পরিচিতি; এইবার উপন্যাসটির সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো।

শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান কাহিনী সংক্ষেপ

শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান- এর এই উপন্যাসটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে কাসেদ। কাসেদ একজন মধ্যবয়স্ক যুবক এবং সে পেশায় একজন কেরানী। কাসেদের পরিবারে তার মা ছাড়াও আর একজন সদস্য রয়েছে সে হল নাহার। ছোটবেলায় বাবা-মা হারিয়ে ফেলা নাহারকে কাসেদের মা নিজের সন্তানের মতোই আদর ,স্নেহ,ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করেছেন। তাই নাহারকে নিয়ে কাসেদের মা নিজের সন্তানের মতোই চিন্তা করে। কাসেদের মা নাহারকে সুখী দেখতে চান, তাই তিনি ভালো পাত্র খোঁজ করছেন নাহারের জন্য।

কাসেদ তার পেশাগত কারণে ব্যস্ত থাকলেও তার মধ্যে এক ধরণের রোমান্টিকতা কাজ করে। কাসেদ তার অবসর সময়ে কবিতা লিখে। কাসেদ ভালবাসে জাহানারাকে। একদিন জাহানারাকে বিয়ে করবে এমন সপ্নে সে বিভোর। শহরে অনেক বড় বাড়ী থাকবে বা অনেক দাস – দাসী থাকবে; এমন কোনো আশা তার নেই। শহরতলীতে ছোট্ট একটি বাড়ি থাকবে; সেখানে জাহানারাকে নিয়ে সুখে থাকবে এমন স্বপ্নে বিভোর কাসেদ।

কাসেদ জাহানারাকে নিয়ে অনেক সপ্ন দেখে এবং সে মনে মনে ভাবে জাহানারাও কি তাকে ভালবাসে? যতই সময় গড়ায় জাহানারাকে ঘিরে তার স্বপ্নগুলো ততই ক্ষীণ হয়ে যায়। জাহানারা কি আদৌ তাকে ভালোবাসে এই নিয়ে সংশয়ে পরে যায় কাসেদ। একদিন জাহানারার বাড়িতে কাসেদ গেলে জাহানারা কাসেদকে তার বান্ধবীদের এবং কাজিনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। জাহানানার বান্ধবীর নাম মিলি চৌধুরি।

সে ইডেনে পড়ে। জাহানারার কাজিনের নাম হল শিউলি। শিউলি কাসেদের সাথে একটু একটু করে ঘনিষ্ঠ হতে চায়। কিন্তু, কাসেদের মন পড়ে আছে জাহানারার কাছেই, সে জাহানারাকে মনে প্রাণে ভালোবাসে এবং সে যদি বিয়ে করে একমাত্র জাহানারাকেই করবে বলে মন স্থির করে।

শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান বই রিভিউ

জাহানারা এবং শিউলির পরে গল্পে নতুন চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। তার নাম সালমা। সে কাসেদের ছোটবেলার খেলার সাথী এবং সম্পর্কে কাসেদের খালাতো বোন। সালমা এখন অন্য আরেকজনের স্ত্রী। সালমার একটি সন্তানও রয়েছে। সালমা চায় কাসেদের হাত ধরে পালিয়ে যেতে। সালমার স্বামী সন্তান থাকা সত্ত্বেও সে এক অন্তহীন শূন্যতায় ভোগে। তার দাম্পত্য জীবনে সে চরম অসুখী।

তাই, সে তার বাল্যপ্রেমের কাছে ফিরে আসতে চায় সুখের সন্ধানে। কাসেদ যথেষ্ট বোধ-বুদ্ধি সম্পন্ন একজন মানুষ। সে সালমার আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করে তাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়।একদিন জাহানারাদের বাড়িতে ঢুকতেই কাসেদ বারান্দায় তাদের বাড়ির বৃদ্ধা পরিচারিকাকে সেলাই করতে দেখলে সে কাসেদকে বলে আপা মাস্টারের কাছে সেতার শিখছে। কাসেদ বাড়িতে ঢুঁকেই থমকে দাঁড়ালো!

কাসেদের অপেক্ষায় না থেকে জাহানারা নিজে থেকেই একজনকে খুঁজে নিয়েছে, তাই নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে কাসেদের। জাহানারা কাসেদের জন্য অপেক্ষা করে হতাশ; তাই সে নিজে থেকেই অন্য কাউকে খুঁজে নিয়েছে।
জাহানারার ঘর থেকে মৃদু হাসি আর সেতারের টুং-টাং শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

জাহানারার ঘরে কাসেদ ঢোকার পরেই জাহানারা তার সঙ্গীত শিক্ষকের সাথে কাসেদের পরিচয় করিয়ে দেয়। তাদের মধ্যকার অন্তরঙ্গতা দেখে কাসেদ জাহানারাকে বলে, “এ কি করলে তুমি জাহানারা?” কাসেদ জাহানারাকে বলে, সে তার হৃদয়ের সকল আবেগ-অনুভূতি দিয়ে জাহানারাকে ভালোবাসে তার মূল্য কি জাহানারার কাছে নেই?

কাসেদ জাহানারাকে কে বলে দুই দিনের চেনা জানায় সে কিভাবে ঐ শিক্ষককে ভালোবাসে, সে কতটুকু জানে ঐ শিক্ষকের ব্যপারে? জাহানারা বলে সে ঐ শিক্ষককে ভালো মনে করে দেখেই তাকে ভালোবাসে। জাহানারার অন্য পুরুষের প্রতি ভালোবাসা দেখে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরে কাসেদ। একদিন নিউমার্কেটের মোড়ে ব্যথায় অভিমানে কাতর হয়ে শিউলির সামনে এসে দাড়ায় কাসেদ।

পুরো শহর ঢেকে গেছে সন্ধার ধূসরতায়। শিউলি কাসেদকে দেখে মিটি মিটি হাসছে। কাসেদ জাহানারাকে শিউলির মাঝে আবিষ্কার করতে চাচ্ছে। বার বার চেষ্টা করেও কাসেদ শিউলির মাঝে জাহানারাকে আবিষ্কার করতে পারছে না। এমতাবস্থায় শিউলিও কাসেদকে প্রত্যাখ্যান করে। তখন খালাতো বোন সালমাকে খুব মনে পরে কাসেদের।

কয়েকদিন যাবত কাসেদের মায়ের শরীরটা খুব একটা ভালো না। মাঝে মাঝেই উনার শরীরে জ্বর আসে আবার চলে যায়। এতো কিছুর মধ্যেও নামাজ এবং দুরুদ পাঠ করা তিনি বাদ দেননি। তিনি মাঝে মাঝে দুঃখ প্রকাশ করেন এই ভেবে যে তার অবর্তমানে কাসেদ আর নাহারের কি হবে?

কাসেদের মা কাসেদকে বললেন; তোর খালু নাহারের জন্য ভালো একটা সম্বন্ধ এনেছে। তিনি আরও বলেন ছেলেটা দেখতে শুনতে ভালো হওয়ায় তিনি বিয়েতে মত দিয়ে দিয়েছেন, এবার তুই বিয়েতে মত দিলেই হয়ে যায়। কাসেদ মাকে বলে “আমার মতামতের কি প্রয়োজন? তোমরা যা ভালো মনে করো, তাই করবে” -এর মধ্যে কাসেদের মা কাসেদকেও বিয়ে করার কথা বলে।

তিনি বলেন “আমার শারীরিক অবস্থা ভালো না, কবে মারা যাই তার ঠিক নেই! তাই মৃত্যুর আগে আমি তোকে সংসারী ও সুখী দেখতে চাই।” একদিন রাতে বিষণ্ণ মনে কাসেদ বাড়ি ফিরে। বাড়ি ফিরেই দেখতে পায় তার মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে! কাসেদ হাতড়াতে হাতড়াতে ক্লান্ত হয়ে ধপ করে শুয়ে পরে বিছানায়। মায়ের মৃত্যুর কিছু দিন পরে আবার চমকে উঠে কাসেদ।

শেষ বিকেলে তার সামনে একটি মেয়ে দাড়িয়ে আছে। মেয়েটির পরনে লালশাড়ি, গায়ে হলুদ মাখা। মেয়েটি জাহানরাও না, সালমাও না, শিউলিও না– মেয়েটি নাহার। না, কাসেদ নাহারকে ফিরিয়ে দেয় না। তো এই ছিল শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান এর উপন্যাসটির কাহিনী সংক্ষেপ।

শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান পাঠ পরবর্তী পর্যালোচনা

শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান- এর এটি প্রথম উপন্যাস এবং উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৬০ সালে। আর, তখন বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যে এইরকম রোম্যান্টিক ধারার উপন্যাস তেমন পাওয়া যেত না। ফলে তৎকালীন সময়ে উপন্যাসটি বাংলা রোম্যান্টিক ধারার এটি সাবলীল উপাখ্যান। একই সাথে একজন মানুষের জীবনে অলীক বিচ্ছেদ আর তার পরেই এক অমর প্রেমের মিলনের দ্বার উন্মোচন করে।

খুব বেশি কিছু বলার নেই, উপন্যাসটি বর্তমান সময়েও অনেকের জীবনে কাকতালীয় ভাবেও ঘটে যায় হয়তো। তাই, বলা যায় শেষ বিকেলের মেয়ে-জহির রায়হান এর একটি সরল, সাবলীল এবং অনন্য একটি রোম্যান্টিক উপন্যাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published.