September 30, 2022
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলা সাহিত্য

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলা সাহিত্য

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলা সাহিত্য অপরিহার্য ভুমিকা রাখে; যার বিভিন্ন দিক বিবেচনা করলে এক আলোচনায় শেষ হবে না। তবুও এই নিবন্ধটিতে আমরা চেষ্টা করেছি যেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলা সাহিত্যের বিশেষ দিকগুলো নিয়ে যেন আলকপাত করা যায়। এক্ষেত্রে কোন ভুল তথ্য অথবা ভুল বাখ্যা আপনাদের চোখে পরলে নিজ দৃষ্টি থেকে ক্ষমা করবেন।

বর্তমান সময়ে বসে আসল ইতিহাস; অথবা নায়ক-খলনায়ক চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। আশাকরি, আপনাদের এই নিবন্ধটি ভালো লাগবে।

বাংলাদেশের জন্ম ও সাহিত্য প্রশঙ্গ

পৃথিবীর প্রতিটি দেশের ভাষা ও সাহিত্য সেই দেশের মানুষকে প্রতিনধিত্ব করে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাঙালির মনের মণিকোঠায় আছে। বাঙালি জাতি তাদের মাতৃভাষা বাংলার অধিকার অর্জন করার জন্য ভাষা আন্দোলন করে। এই ভাষা আন্দোলনে অনেক শিক্ষার্থী, জ্ঞানী- গুণী ও বুদ্ধিজীবীরা নিহত এবং আহত হয়।

এরপর নিজেদের অধিকার সচেতন হয়ে বাঙালিরা ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গন- অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এই সব কিছুর সূত্রপাত হয় ভাষা আন্দোলন দিয়ে। ভাষা আন্দোলন হয় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে।পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই এর মাতৃভাষা বাংলা নাকি উর্দু হবে তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

তৎকালীন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬.৪০ % মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলত। উর্দুতে মাত্র ৩.২৭ % মানুষ কথা বলতো। অন্যান্য ক্ষেত্রেও বাঙালিদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়। বিশেষ করে ভাষা- সংস্কৃতি, সামাজিক, অর্থনীতিক ক্ষেত্রে বাঙালিরা বেশি বৈষম্যের শিকার হতো। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাঙালির আবেগের অনেক বড় একটি জায়গা জুড়ে আছে। তাই বাংলা ভাষা- সাহিত্যের মুক্তিযুদ্ধে অনেক অবদান রয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলা সাহিত্য

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ। তথাপি, যুদ্ধে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিল্পী- সাহিত্যিক – বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন সংস্কৃতি কর্মীর অবদান ছিল প্রশংসনীয়। পত্র -পত্রিকায় লেখা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খবর পাঠ, দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান, কবিতা পাঠ, নাটক, কথিকা ও অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান – “চরমপত্র” ও “জল্লাদের দরবার” ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।

রণক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক ও নৈতিক বল ধরে রাখতে উল্লিখিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সহায়তা করেছে, সাহস যুগিয়েছে, জনগণকে শত্রুর বিরুদ্ধে দুর্দমনীয় করে তুলেছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে বাংলা দেশাত্মবোধক গান গেয়ে এবং প্রচার করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়ে বিজয়ের পথ সুগম করে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা তথা সকল মুক্তিকামী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে, তাদের মনে চূড়ান্ত বিজয়ের আশার আলো জাগিয়ে তুলতে দেশের জনপ্রিয় মহিলা সঙ্গীত শিল্পী, নাট্যকর্মী, সংবাদ পাঠিকা বাংলা বেতারসহ অনেক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন শিল্পী সংস্থার ব্যানারে পুরুষ ও মহিলা শিল্পীগণ সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরে ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা করা ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করেছেন।

স্বাধীন বাংলা বেতারে এসব শিল্পী কলা- কুশলীদের দেশাত্মবোধক গান, লেখক- সাহিত্যিকদের আলোচনা পর্যালোচনা আপামর বাঙালি জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে রেখেছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলা সাহিত্য

মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দিতে অনেক গান প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি । এই গানটি গেয়েছেন সুর সঙ্গীত করেছেন আপেল মাহমুদ। গানটি লিখেছেন গোবিন্দ হালদার। গানটির জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি আজও মানুষের মুখে মুখে গানটি শোনা যায়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী এই গানটি আজীবন এভাবেই অমর হয়ে থাকবে।

মাগো, ভাবনা কেনো আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে” এই গানটিও একটি কালজয়ী গান। এই গানটি লিখেছেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার আর গানটির সুর করেছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এছাড়াও আপেল মাহমুদ এর আরেকটি কালজয়ী গান রয়েছে সেটি হলো তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে। এই গানটি সুর সঙ্গীত লেখা এবং গেয়েছেন আপেল মাহমুদ।

তাছাড়া জহির রায়হান-ও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র বানিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছিলেন।মক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রথম উপন্যাস রচনা করেন আনোয়ার পাশা। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক এই প্রথম উপন্যাসটির নাম হলো ”রাইফেল রোটি আওরাত”। মো: জাফর ইকবাল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিশুতোষ উপন্যাস লেখেন যার নাম হলো “আমার বন্ধু রাশেদ”। সেলিনা হোসেন লিখেন হাঙ্গর নদী গ্রেনেড এবং যুদ্ধ উপন্যাসটি।

হুমায়ুন আহম্মেদ অনেক উপন্যাস লিখেছেন শ্যামল ছায়া, জোছনা, জননীর গল্প,১৯৭১ এবং আগুনের পরশমণি– র মতো উপন্যাস।মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সেলিনা হোসেন এর একাত্তরের ঢাকা , জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি , সুফিয়া কামালের একাত্তরের ডায়েরি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও, আব্দুল গফফার চৌধুরী রচনা করেন ইতিহাসের রক্ত পলাশ – এর মতো গ্রন্থ।

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অনেক চলচ্চিত্র হয়েছে এর উল্লেখযোগ্য হলো জহির রায়হানের A state in born, বাবুল চৌধুরীর Liberation fighter, তারেক মাসুদ এবং ক্যাথরিন মাসুদের দুটি চলচ্চিত্র হলো মুক্তিরগান এবং মুক্তির কথা। জহির রায়হানের আরও দুটি চলচ্চিত্র হলো “Stop Genocide” এবং “A state is born

তানভীর মোকাম্মেল এর মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র হলো স্মৃতি ৭১ এবং গীতা মেহতার ”ডেটলাইন বাংলাদেশ”।শুধু বাংলাদেশের কবি সাহিত্যিক কিংবা শিল্পীরাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেনি বিদেশি অনেক সঙ্গীত শিল্পীরা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে। জর্জ হ্যারিসনকনসার্ট ফর বাংলাদেশ”  আয়োজন করার মাধ্যমে

বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং সেই কনসার্ট থেকে অর্জিত অর্থ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দান করে দেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনেক শ্রেণী পেশার মানুষ ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের মধ্যে কবি- সাহিত্যিক , শিল্পীদের অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলা সাহিত্যের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

মুক্তিযুদ্ধে বাংলা সাহিত্যের ভুমিকা নিয়ে শেষ কিছু কথা

উপরের আলোচনা থেকে আমরা জেনেছি, কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে বাংলা সাহিত্য, মুক্তিযোদ্ধাদের সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে অবদান রেখেছে। শিল্প ও সাহিত্য দুই-ই একি প্রবাহে চলমান দুটি নৌকা; যা মানুষের কথা বলে। শিল্পকেও সাহিত্য আর সাহিত্য কেও শিল্প বলা যায়। এবং, এই দুইয়ের মাঝে যখনি পার্থক্য অথবা বিরোধ করার চেষ্টা করা হবে, তখনি ভেঙ্গে পরবে মানব সভ্যতা এবং হয়ে যাবে সব ভোঁতা।

আর, শুধু মুক্তিযুদ্ধে নয়; প্রত্যেক মানুষের মুক্তিতে ওতপ্রোত ভাবে ভুমিকা রাখে। তো, এই পর্যন্তই বলার ছিল। আশা করি, আপনাদের ভালো লেগেছে। ভাষাগত ভুলের জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। যদি চান আরও পড়তে পারেন আরেক ফাল্গুন-জহির রায়হান

Leave a Reply

Your email address will not be published.