September 29, 2022
মরণ বিলাস-আহমদ ছফা বই রিভিউ

মরণ বিলাস-আহমদ ছফা বই রিভিউ

মরণ বিলাস-আহমদ ছফা বই রিভিউ হল আজকের এই নিবন্ধটি। এই নিবন্ধটিতে আমরা জানবো স্বাধীন বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, ঔপন্যাসিক, কবি ও দার্শনিক আহমদ ছফা-র লেখা একটি ছোট উপন্যাস “মরণ বিলাস” এর পাঠ পরবর্তী মতামত। আর, এই নিবন্ধটিতে চেষ্টা করবো আপনাদের একটা সূক্ষ্ম  অনুভূতির মতামত বৃত্তান্ত দেয়ার।

আহমদ ছফা এই বইটি লিখেছিলেন কবে তা সেভাবে জানা যায়নি। তবে, ১৯৮৮ সালে তাঁর এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁরপর থেকেই আহমদ ছফা-র পাঠকবৃন্দের মধ্যে বিপুল আলরন তৈরি করে ” মরণ বিলাস” উপন্যাস।

মরণ বিলাস-আহমদ ছফা

“মরণ বিলাস” আহমদ ছফা-র একটি রাজনৈতিক উপন্যাস বলা যায়। এই উপন্যাসটিতে যেভাবে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুশয্যার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা বেশ সূক্ষ্ম; এবং তাতে বিসভিন্ন মতবাদ, ঘটনা এবং মনস্তত্ত্ব প্রকাশ পেয়েছে।

এবং সেই চিত্রপটে মূল ভুমিকায় আছেন ক্যান্সার আক্রান্ত মৃত্যুমুখি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফজলে ইলাহি। আর, তাঁর শেষ শয্যায় বসে অথবা কখনও দাড়ায়ে আছে একজন পাতিনেতা ও রাষ্ট্রপতির সুদৃষ্টিতে আসতে ব্যাকুল মওলা বক্স

মরণ বিলাস-আহমদ ছফা বই রিভিউ

মরণ বিলাস-আহমদ ছফা বইয়ের মোড়ক

“মরণ বিলাস” উপন্যাসটি পুরটাই মূলত মন্ত্রী ফজলে ইলাহি ও মওলা বক্সের মধ্যে কথোপকথন। আর, সেই কথোপকথনে মূল বক্তা শয্যাশায়ী মন্ত্রী আর একজন ধৈর্যশীল শ্রোতা এবং নিজের চেহারা নিজের ভেতরে গুম করে ফেলতে সক্ষম মওলা বক্স। কথোপকথনের চরিত্র মন্ত্রী ও মওলা বক্স উভয়েই স্বার্থান্বেষী।

শুধু পার্থক্যটা এইখানে যে মন্ত্রী তার সারাজীবন স্বার্থান্বেষী হয়ে পার করে শেষ সময়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে সঙ্গীহীন অবস্থায় মৃত্যুশয্যায় আরেকজন ঊর্ধ্বগামী স্বার্থান্বেষী মওলা বক্সের সাথে তাঁর জীবনের সকল অপকর্মের কথা ব্যক্ত করছে।

এবং, সেখানে মওলা বক্স নিজে আরেকজন স্বার্থান্বেষী হলেও সে যখন মন্ত্রী ফজলে ইলাহির ভয়ানক পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের কথা শুনছে; তখন বার বার নিজের মনজগতের গভীরে একবার, আড়ালে একবার, উঠোনে একবার তো কখনও বাইরেই প্রকাশ পাচ্ছে মন্ত্রির পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের প্রতি ঘ্রীণা। এই ভাবেই মওলা বক্সের চোখে মুখে তার ভেতরের অস্থিরতা ভেসে ওঠে।

অপরদিকে শয্যাশায়ী মন্ত্রী চায় তার জীবনের যত গোপন অপকর্ম আছে তা অন্তত পৃথিবীর একজন মানুষকে বলে যেতে পারলে তার আর নইজের জীবনকে ব্রিতা মনে হবে না। আর, মন্ত্রী চায়না তার এত গোপন অপকর্মের বোঝা সে একা বয়ে নিয়ে যাক পরপারে। তাই, মওলা বক্সকে বলে যেতে চায় তার সব গোপন পৈশাচিক কর্মকাণ্ড।

আর মৃত্যুর আগে তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে তার জীবনের শুরুর দিকের পৈশাচিকতা থেকে শেষ সময়কার পৈশাচিকতা। সে বলে, কীভাবে সে একজন ধর্মপ্রাণ পরিবারের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও সব কিছু নিশ্চিহ্ন করেছিল ক্রোধ, হিংসা আর নিজের স্বার্থের তাগিদে। সে বলে সে ছোটবেলা থেকেই ছিল পিতার অবাধ্য।

আর তার সৎ ভাইকে হিংসার বসে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেছিল। তারপর এক সময় সে রেঙ্গুন প্রবাসী তার চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে জরিয়ে পড়েছিল গভীর প্রণয়ে আর তার সাথে দীর্ঘকাল শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে লোকলজ্জায় আত্নহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিল সেই নারী।

এরপর স্কুল জীবনে পড়াকালীন সময়ে অসৎ সঙ্গ পেয়ে জড়িয়ে পরেন নানা অপকর্মে। ঘৃণার আগুনে জ্বালিয়েছে তার স্কুলের হিন্দু হেডমাস্টারের বসতবাড়ি; দগ্ধ করেছে তার হেডমাস্টার ও তার সব সহায়সম্বল। কীভাবে রাজনীতির সাথে জুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে পরবর্তীতে সাধু নেতা সাজে। কীভাবে তার রাজনৈতিক সফলতা পায় সব ভয়ানক ঘৃণ্য পৈশাচিক কাজের পরও। আর তার কোন অপকর্মের জন্য সেই অনুতপ্ত নয়! বরং দুষে যায় তার জীবনের প্রেক্ষাপটকে, সমাজ-পারিপার্শ্বিকতা- আর মহাকাল।

সে আরও বলে, সে যে শুধু খারাপ কাজই করেছে তা না, তার জীবনে সে একটা মহৎ কাজ করেছে; আর তা হল একজন কিশোরের জীবন ভিক্ষা দিয়েছে সে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় একজন কিশোরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাচিয়েছে সে। আর তার সেই মহৎ কাজ তাঁকে বার বার তার পাপবোধে গ্রাস হওা থেকে বাঁচাচ্ছে।

যখন মৃত্যুশয্যায় তার জীবনের সকল অপকর্মের পাপবধ তাকে বাজেয়াপ্ত করতে চায় তখন সেই কিশোর এসে বাঁচায় তাকে। কিন্তু, তার অপকর্মের কথা শুনে; মওলা বক্স নিজের মধ্যে যুদ্ধ করছিল। ভাবছিল তার সাথেই কেন এসব হল? কেন তাকেই এইসব শুনতে হল। সে ভাবতে পারছিল না মন্ত্রী মারা যাবার পর তার জীবনে কি হবে।

সে নিজেও অনেকখানি মন্ত্রির মতো চিন্তা রাখা সত্ত্বেও মেনে নিতে পারছিল না “মানব সন্তানের রূপে, এই রাক্ষস বৃত্তান্ত!” তারপর মন্ত্রীর শেষ নিঃশ্বাসের আগে মন্ত্রী যখন তাকে বলল একটা আলো এসে গ্রাস করছে তাকে; আর তারপরেই নিথড় মন্ত্রীর দেহ।

শেষ হয়ে গেল মন্ত্রীর মরণ কালের পূর্বে নিজের সব গোপনীয়তা সম্বন্ধে বলে যাওয়া মরণ বিলাস।

মরণ বিলাস-আহমদ ছফা বই রিভিউ উপসংহার

তো ঐ ছিল মূলত আহমদ ছফার বিরচিত উপন্যাস “মরণ বিলাস” এর মূল বিষয় আর আমার পাঠ পরবর্তী মতামত সংক্ষিপ্ত আকারে লেখব এই উপশংহারে। “মরণ বিলাস” উপন্যাসটি যতটা না রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক।

প্রত্ত্যেক্তি মুহূর্তে মনের ভেতর ঘটে যায় অনেকগুলো ভাবনা- দুর্ভাবনার ঝড়। ঘটে যায় পরিপ্রেক্ষিত বের করার দ্বন্দ্ব। মর্মান্তিক সব ঘটনার বর্ণনায় পাঠকের মনের ভেতর এক জলোচ্ছ্বাস বয়ে যায়।

তো এই ছিল আহমদ ছফার “মরণ বিলাস” উপন্যাসের বই রিভিউ। চাইলে এমন আরও বই রিভিউ পড়তে পারেন আমাদের ওয়েবসাইটে। যেমন; হাজার বছর ধরে বই রিভিউ

Leave a Reply

Your email address will not be published.