September 27, 2022
বাউল গানের ইতিকথা

বাংলা বাউল গানের ইতিকথা জেনে নিন!

বাউল গানের ইতিকথা বলতে; বাউল গানের তত্ত্ব-সত্তা এবং বাউল গানের পথ চলাকে বোঝানো হয়েছে। এক্ষেত্রে এই নিবন্ধটিতে চেষ্টা করবো বাংলার বাউল গানের ধারা-অধারা-বর্তমান অবস্থা এবং বাংলার মানুষের জীবনের সাথে বাউল গান-এর সক্ষতা নিয়ে বর্ণনা করা চেষ্টা করবো।

বাংলার ঘাটে-মাঠে বাউলদের বিচরণ, এবং তাদের গানের মাধ্যমেই ভেঙ্গে পড়ে বাংলার মানুষদের মধ্যেকার ধর্মের দেয়াল; এবং সব ধরনের কুসংস্কার আর হয়ে যায় শুধুই মানুষ!

বাউল কি? কোথা থেকে এলো বাউল?

বাউল কি? তা আসলে কোন নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিয়ে বা কোন একক বাক্যদিয়ে বোঝানো সম্ভব না। তারপরও, বিভিন্ন বিজ্ঞজনরা বিভিন্ন ভাবে ” বাউল কি?”, এবং ” বাউল কারা ?”- তা সংজ্ঞায়িত করেছেন। আমরা যদি বাউল গানের ইতিকথা জানতে চাই; তবে প্রথমেই আমাদের বাউল কি বা কারা তা জানা প্রয়োজন।

বাউল শব্দের উদ্ভব নিয়ে কথা বলতে গেলে দেখা যায়; মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে “বাউল” শব্দের ব্যবহার। তারপর, এমনকি পনের শতকের শাহ মোহাম্মদ সগীরের “ইউসুফ-জুলেখা“, মালাধর বসুর “শ্রীকৃষ্ণবিজয়“, এবং ষোল শতকের বাহরাম খানের “লায়লী-মজনু” ও কৃষ্ণদাস কবিরাজের “শ্রী চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে।

পনের শতকের শাহ মোহাম্মদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা, মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণবিজয়, ষোলো শতকের বাহরাম খানের লায়লী-মজনু এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থেও “বাউল” শব্দের ব্যবহার আছে। যা অনেক খানি প্রমান করে যে বাউলরা এখানে পনের শতকেও ছিল।

তারপর এই সাম্প্রতিক কালের এক গবেষণায় পাওয়া যায়; অষ্টম-নবম শতকে তৎকালীন পারস্যের সুফিসাধনা প্রবর্তনকালে “বা’আল” নামে সুফু সাধনার একটি শাখা গড়ে ওঠে।  সঙ্গীতাশ্রয়ী এবং মৈথুনভিত্তিক গুপ্ত সাধনপন্থী ছিল বা’আলরা। বা’আলরা মরুভূমির বিভিন্ন অঞ্চলে গান গেয়ে বেড়াত এবং অন্যান্য সুফি-সাধকদের মতো তাদের এইভাবে আগমন ঘটে বাংলায়।

বাউল শব্দের উৎপত্তি ও বিভিন্ন বিষয়বস্তু

বাউলদের আচরণের বিচিত্রতা এবং অদ্ভুত ভাবের কারণে কেউ কেউ তাদের “পাগল” বলেও আখ্যায়িত করতো। এ কারণে সংস্কৃতে “বাতুল“, যার অর্থ পাগল, কাণ্ডজ্ঞানহীন  এবং “ব্যাকুল” যার অর্থ বিহবল, উদ্ভ্রান্ত। এই দুই সংস্কৃত শব্দদ্বয়কে “বাউল” শব্দের উৎপত্তি মনে করা হয়।

আবার, অনেকে ধারণা করেন পারসি “বা’আল” বা আরবি “আউলিয়া” যার অর্থ বন্ধু, ভক্ত;  এই শব্দদ্বয় থেকেও “বাউল” শব্দের উৎপত্তি। বা’ আলরা তাদের বন্ধুর খোঁজে মরুভূমিতে পাগল বা ক্ষ্যাপার মতো গান গেয়ে বেড়ায়। তারা সংসারত্যাগী এবং সকল বাধা-বন্ধনহীন। আর, এইসব আমাদের দেশিও বাউলদের মধ্যেও এইসব বিষয়গুলো লক্ষ করা যায়। এবং বাউলদের এই “ক্ষ্যাপা” বা “পাগল” ভাব; তা কেবল সুফি শব্দ “দিওয়ানা” এর সাথেই তুলনীয়।

বাউল গানের ইতিকথা

বাউল গানের ইতিকথা বলতে বাউল গানের ধারা, তার বিষয়বস্তু এবং তাঁদের গানের উৎপত্তি সম্পর্কিত সব রকমের আলোচনাই একত্রে বাউল গানের ইতিকথা।

ওপরের অংশ হতে প্রথমেই জানতে পেরেছেন যে বাউলদের দর্শন এসেছে পারস্যের “বা’আল” -দের থেকে। এবং এই বঙ্গে এসে মিলিত হয়েছে যখন তখন সেই দর্শনে আরও যোগ হয়েছে বৈষ্ণব ধর্মের দর্শন। যার ফলে বাউল গানে দুই দর্শন-ই পাওয়া যায়; একটি হল বৈষ্ণব এবং অপরটি মুর্শিদি।

বাউলদের মতে, তাদের সাধনায় যে পরমারাধ্য বা পরম পূজনীয়; সেই হল বাউলের মনের মানুষ এবং বাউলরা আরও মানেন সেই মানের মানুষের বাস তার নিজেরই দেহে। এবং মুলত তাকেই বাউল-রা বলে সাঁই, মুর্শিদ, বা গুরু। এবং সেই মনের মানুষের সান্নিধ্যলাভেই পাগল বাউলরা। তাই প্রত্যেকটা গানে সেই আকুলতা, বিরহ এবং মনের মানুষের প্রতি স্তুতি খুঁজে পাওয়া যায়।

 বাউল গানের ইতিকথা

এক কথায় বাউল গানের ইতিকথায় খুঁজে পাওয়া যায়, নিজের স্বরূপ ও আত্মাকে খোঁজার আকুলতা। সেই সাথে খুঁজে পাওয়া যায় প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক এবং দেহতত্ত্ব। দেহতত্ত্বের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত এনং চড়ায়- উতরায়। সেখানে বলা হয়েছে নিজেকে ষড়রিপু থেকে দূরে রাখতে।

বলা হয়েছে ষড়রিপুর ফাদে যে পড়লো, সে হারাবে জীবন নদীর এ কুল – ওকুল। ষড় অর্থ ছয় এবং রিপু অর্থ কণ্টক অথবা শত্রু। এবং মানব জীবনে যেই ছয়টি কাটার কথা বলা হয়েছে; এগুলো হল কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ বা অহংকার ও মাৎসর্য্য বা হিংসা।

আরেকটি ক্ষেত্রে দেখা যায়; বাউলদের সাধারণ সংসারের প্রতি অনীহা। মুলত তাদের দর্শন অনুযায়ী; কোনো মানুষ যখন সংসার করার জন্য প্রতিজ্ঞা করে তখন এই ছোট জীবনে সেখানে সামাল দিতেই হাবু-ডুবু খেয়ে যায়। যার ফলে দেখা যায় তার জীবনে জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই সংসার জীবনকে বেশির ভাগ বাউলই ফাঁদ মনে করেন। আর, যার কারণে তাদের বিভিন্ন গানে সংসার জীবনের বিভিন্ন দিককে ব্যাঙ্গ করতে দেখা যায়।

সর্বোপরি বাউল গানে যা বিদ্যমান; তা হল শুধু মানুষের কথা এবং সেখানে নেই কোন ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কিংবা কোন জাতি। যা আমাদের সবাইকে এক করে শুধু মানুষ হিসেবে। মুলত বাউল গানের এই বিষয়বস্তুর কারণেই আমাদের অন্তরে লেগে আছে বাউল গান। আর, বাউল গানের ইতিকথায় হল মানুষের মানুষ কোথা?

বর্তমান বাউলদের অবস্থা

যদিও বর্তমানে বাউল গানের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে অনেক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে বাউলদের খ্যাতি এবং বাউল গানের চর্চা আগের থেকে অনেক গুনে বেড়েছে। তবে আবার সেই বাড়াবাড়ি আর অধিক মাতালতার কারণে দেখা যায়; অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় বাউল সংগীত-কে ভাবা হয় গাঁজাখোরী দর্শন। কিংবা, যখন কেও বাউল এর ছবি কল্পনা করছেন; প্রত্যেক মুহূর্তে তারা গাঁজা ছাড়া আর অন্য কিছু কল্পনা করতে পারেন না।

যদিও এটি অনস্বীকার্য যে যারা বাউল; তাদের বেশির ভাগই এই অবৈধ জিনিসের চর্চা করে থাকেন। তবে তাদের মতে এটি মন শান্ত করে রাখে এবং এই জগত থেকে দূরে রেখে নিজেকে মনের মানুষের কাছে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। কিন্তু, যারা এই সমস্ত দর্শন জানেন না, কিন্তু বাউল গান শোনেন; তাদের কাছে বেপার তা অন্য হয়ে দাঁড়ায় এবং তারা শুধু মাত্র গান গাওয়ার ছলে ঢুকে পড়ে নেশার জগতে।

যার কারণে বর্তমান সমাজে আজও আমাদের বেশির ভাগ বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষরা বাউলদের জীবনকে খুব ছোট করে দেখেন এবং তাদের দর্শনকে নিতান্ত ভবঘুরে-পাগল- ভিক্ষুক বলে উড়িয়ে দেন। যার প্রকপতা এখনও দেখা যায়।

আশা করি, যারা পড়েছেন তারা এই পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। আশা করি ভালো লেগেছে। আর চাইলে আরও পড়তে পারেন বাংলা গানের ইতিকথা

Leave a Reply

Your email address will not be published.