May 24, 2022
জহির রায়হান-উপন্যাস নাকি চলচ্চিত্র

জহির রায়হান-উপন্যাস নাকি চলচ্চিত্র?

এখানে ” জহির রায়হান-উপন্যাস নাকি চলচ্চিত্র? ” শিরোনামটির দ্বারা বোঝানো হয়েছে জহির রায়হানের উপন্যাস; যেগুলোর প্রত্যেকটির লেখনশৈলী চলচ্চিত্রের উপাখ্যানের মতো। এবং যারা জহির রায়হানের উপন্যাসগুলো পড়েছেন তারা জানেন, জহির রায়হান তাঁর উপন্যাসের বর্ণনায় একটি ঘটনার চিত্র যেভাবে তুলে ধরেছেন তা শুধু চিত্র নয়; অনেকাংশে আমাদের পাঠকদের মনজগতে ঘটে যায় তখন, একটি বাস্তব ঘটনার অলিক চলচ্চিত্র।

আজকের এই নিবন্ধটি উৎসর্গ করা হল, জহির রায়হানের লেখা চলচ্চিত্রিত উপন্যাসগুলোকে, যেগুলো বাঙ্গালী পাঠকদের মনে একটি নতুন জগতের সৃষ্টি করে। তাই, দেড়ী না করে শুরু করা যাক নিবন্ধটির শিরনাম ধরে ” জহির রায়হান-উপন্যাস নাকি চলচ্চিত্র? ”

প্রথমে আমরা সংক্ষিপ্তভাবে জানবো জহির রায়হান সম্পর্কে, তারপর আলোচনা করবো এই কিংবদন্তী বুদ্ধিজীবীর চলচ্চিত্রের ন্যায় উপন্যাস লেখার লিখনশৈলী নিয়ে।

জহির রায়হান-উপন্যাস নাকি চলচ্চিত্র?

জহির রায়হান এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

জহির রায়হান এর জন্ম ১৯ আগস্ট ১৯৩৫ সালে অবিভক্ত ভারতের ফেনী জেলায়। তিনি ফেণীর সোনাগাজি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। এরপর, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পরিবারের সাথে কলকাতা হতে চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। তাঁর বাবা মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক ছিলেন। এরপর পূর্ব পাকিস্তানে আসার পর ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োজিত হন। জহির রায়হান তাঁর শিক্ষা জীবনের প্রথমে কলকাতায় মিত্র ইনিস্টিউটে এবং পরবর্তীতে আলীয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন।

এরপর যখন দেশ ভাগের সময় তারা বাংলাদেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে তাঁর গ্রামের বাড়ি চলে আসেন এবং এরপর ১৯৫০ সালে তিনি আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তাঁর মাধ্যমিক শিক্ষা পার করেন এবং ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তি হন। তিনি সেখান থেকে এরপর আই.এস.সি. পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলা স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

জহির রায়হান এর কর্ম ও রাজনৈতিক জীবন

এবং অল্প বয়সেই তিনি কম্যুনিস্ট রাজনীতিতে আকৃষ্ট ছিলেন; যদিও সেসময় কম্যুনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। তারপরও তিনি সে সময় কুরিয়ারের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্যদের মধ্যে একস্থান থেকে অন্য স্থানে চিঠি ও সংবাদ পৌঁছে দিতেন। এবং কম্যুনিস্ট পার্টির নামের খাতায় তাঁর নাম গোপন রেখে ” রায়হান ” নাম দেয়া হয়। তাঁর আসল নাম ছিল ” জহিরুল্লাহ ” এবং পরবর্তী সময়ে তিনি জহির রায়হান নামেই পরিচিত হন।

তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেও একজন সরাসরি আন্দোলনকারী ছিলেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারী যে ১০ জন প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন তাঁদের অন্যতম ছিলেন এবং সেইদিন গ্রেফতার হয়ে কারারুদ্ধ হন।

তিনি ১৯৫০ সালে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন যুগের আলো পত্রিকায় একজন সাংবাদিক হিসেবে। এরপর, আরও বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেন। তিনি ১৯৫২ সালে ফটোগ্রাফি শেখার জন্য কলকাতার প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ফিরে ১৯৫৬ সালে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। এবং, একের পর এক বানাতে থাকেন বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কালজয়ী চলচ্চিত্র, উপন্যাস এবং গল্পগুচ্ছ।

জহির রায়হান-উপন্যাস নাকি চলচ্চিত্র?

জহির রায়হান নির্মিত তিনটি চলচ্চিত্র।

তিনি তাঁর জীবদ্দশায় দুটি বিবাহ করেন। এবং, দুজনই সে সময়কার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র শিল্পী ছিলেন। প্রথমে ১৯৬১ সালে  সুমিতা দেবী এবং পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে সুচন্দা কে বিবাহ করেন। তাঁর অগ্রজ বাংলাদেশের বিখ্যাত প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। যুদ্ধচলাকালিন সময়ে জহির রায়হান গিয়েছিলেন কলকাতায় এবং সেখানে গিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্থানিদের বর্বরতার তথ্যচিত্র তুলে ধরেন বিশ্বের কাছে ” স্টপ জেনসাইড ” শিরনামে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৭১ এর ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান দেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে জানতে পারেন তাঁর ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে দুর্বৃত্তরা তুলে নিয়ে গেছেন, তিনি ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর খবর পেলেন তাঁর ভাইকে ঢাকার মিরপুরে রাখা হয়েছে। তারপর তিনি তাঁর ভাইকে খুজতে বের হন; এরপর তিনি ও তাঁর ভাই কখনও ফেরেননি।

জহির রায়হান-উপন্যাস নাকি চলচ্চিত্র?

জহির রায়হানের সংক্ষিপ্ত জীবনী জানার পর এখন সময় হয়েছে, এই কিংবদন্তী লেখক ও চলচ্চিত্রকারের লেখনশৈলী নিয়ে আলোচনা করার। নিবন্ধের শুরুতেই বলেছি জহির রায়হান-উপন্যাস নাকি চলচ্চিত্র দ্বারা বোঝানো হয়েছে তাঁর উপন্যাসের ঘটনার বর্ণনার মাধ্যমে পাঠকদের হৃদয়ে যে চিত্র আঁকতে চেয়েছেন তা আসলে অনেক খানি চলচ্চিত্রের মতো।

যারা পাঠক আছেন এবং যেই পাঠকগণ এই নিবন্ধটি পড়ছেন; তারা জানেন জহির রায়হান কীভাবে তাঁর উপন্যাসে একটি ঘটনার চিত্রপতব আঁকতে গিয়ে দেখিয়েছেন চলচ্চিত্র। জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস ” শেষ বিকেলের মেয়ে ” প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে, যা একটি রোম্যান্টিক উপাখ্যান। এই উপন্যাস্তিতে জহির রায়হান একটি আধুনিক উপাখ্যান তুলে ধরেন তার মনের ফিল্ম রোলে; তাবে তা খুব বেশি সাড়া জাগায়নি সে সময়ে।

তার ঠিক চার বছর পরেই ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় জহির রায়হানের ২য় উপন্যাস ” হাজার বছর ধরে ” এই উপন্যাসটিতে তার লেখনশৈলী আরও স্পষ্ট হয়। এখানে তিনি একটি ছোট গ্রামের, ছোট একটি অংশের এক আঙ্গিনার মানুষজন ও তাঁদের জীবনের সাথে জড়িত মানুষদের জবের কিছু অংশ বর্ণনার মাধ্যমে শেষক্ষণে তুলে ধরেন হাজার বছরের এক শাশ্বত চিত্র যা গ্রাম বাংলায় ঘটে আসছে হাজার বছর ধরে। সেখানে প্রত্যেকটি ঘটনা ও চরিত্র যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়েছে তার লেখনশৈলীর মাধ্যমে। উপন্যাসটি পড়ার সময় মনে হয় যেন বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে তার ক্যামেরা তাক করে ছিলেন সিনেমাটি ধরার জন্য। কখনও আলো, কখনও অন্ধকার, কখনও খুব শরগল আবার কখন অত্যন্ত একান্ত মুহূর্ত।

যেন লেখার সময় তিনি ঘটনাটির মধ্যে বেঁচেছিলেন একজন অদৃশ্য মানুষ হয়ে, যার ফলে সেই প্রত্যেকটি চরিত্রকে তিনি চিনতে পেরেছেন তাঁদের হাড়ে হাড়ে, এমনকি রক্তমাংসেও! এরপর আবার তার ৩য় উপন্যাস ” আরেক ফাল্গুন ” প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। ” আরেক ফাল্গুন ” উপন্যাসটি লেখক রচনা করেন ১৯৫২ সাল পরবর্তী সময় থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ের পটভূমিতে। এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ২১ শে ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস পালনের একটি সিনেমেটিক তথ্যচিত্রর মতো ফুটে উঠেছে। এখসাথে অনেকগুলো মুখ-চোখ- ও তাঁদের মনের ভেতরের আশা হতাশা ফুটে তুলেছেন।

তবে উপন্যাসটিতে ঘটনার বর্ণনার কথা বলতে গেলে বলা যায় যেন একটি অদৃশ্য ঈগল সেই ঘটনা ওপর থেকে দেখছে এবং তাপর একদম কাছ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, আর যাওয়ার সময় সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে বিষয়বস্তুর আবেগ অনুভব করছে। তার ফলে উপন্যাসটির ঘটনা বর্ণনায় বেশ গতিময়তা দেখা যায়।

এরপর ” বরফ গলা নদী ” (১৯৬৯), তারপর ” আর কতদিন ” (১৯৭০) যেখানে পুরো পৃথিবীর অবরুদ্ধ মানুষের আর্তনাদ, তাঁদের জীবন সংগ্রাম ও শপ্নের আত্মকথন ফুতিয়ে তুলেছেন। এবং বলে রাখা উচিত, ” আর কতদিন ” উপন্যাসে যখন ঘটনাগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গাই রুপান্তরিত হচ্ছিলো, তাতে মাঝখানের দুই প্রেক্ষাপটের মধ্যে যেন পরাবাস্তবতার দ্বার খুলে যায়। এবং, বর্ণনায় যে চরিত্রগুলো ফুটে উঠেছে তাঁদের মুখের রেখাগুলো পর্যন্ত স্পষ্ট অনুভব করা সম্ভব হয় জহির রায়হানের লেখনশৈলীর মাধ্যমে।

তাই বলা যায়, জহির রায়হানের উপন্যাসগুলো শুধু উপন্যাস নয়; বরং চলচ্চিত্রিত উপন্যাস। আশা করি, যারা এই নিবন্ধটি এই পর্যন্ত পড়েছেন; তারা বুঝেতে পেরেছেন জহির রায়হান-উপন্যাস নাকি চলচ্চিত্র?! যদি এমন আরও, নিবন্ধ পড়তে চান তবে আরও পড়তে পারেন, বাংলা কবিতার আবৃত্তি সাহিত্য

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.