September 27, 2022
একুশে বইমেলার ইতিহাস ও বর্তমান

একুশে বইমেলার ইতিহাস ও বর্তমান

একুশে বইমেলার ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানা আজকের নিবন্ধের মূল লক্ষ্য। অমর একুশে বইমালে ব্যাপকভাবে একুশে বইমেলা নামে পরিচিত। শুধুমাত্র একজনের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল এই অমর একুশে বইমেলা। তখনও জানা যায়নি যে একজনের এই উদ্যোগ এই সময় এসে জাতীয় মেলায় পরিনত হবে।

এবং বিপুল মানুষ এতে অংশগ্রহন করবে পাঠক এবং প্রকাশক হিসেবে। এমনকি বিপুল পরিমাণ দর্শনার্থীও বাড়ছে ক্রমশ। আজকের এই নিবন্ধে আমরা একুশে বইমেলার ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে বর্ণনার পূর্বে, আরও জেনে নিবো বইমেলা কোথা থেকে এসেছে। এই পৃথিবীতে প্রথম কবে থেকে বই মেলা শুরু হয়।

বইমেলা কি? বইমেলার উৎপত্তি কোথায়?

সাধারণ অর্থে যে মেলায় বই প্রদর্শিত ও বিক্রয় করা হয়, তাকেই বইমেলা বলা যায়। ব্যাপক অর্থে লিখিত ভাষা সাহিত্যের বিকাশে যখন সেই ভাষায় প্রকাশিত বিভিন্ন ধারার গ্রন্থের প্রদর্শনী ও তা বিক্রয়য়ের ব্যবস্থা করা হয় তখন তাকে বই মেলা বলা হয়।

যদি প্রশ্ন করা হয় বইমেলার উৎপত্তি কোথায়? তবে উত্তর হবে, জার্মানিতে প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাবে বইমেলার শুত্রপাত হয়। এবং এর ঐতিহ্য প্রায় ৫০০ বছরের বেশি। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইমেলা। এমনকি ১২শ শতাব্দীতে ফ্রাঙ্কফুর্ট-এ বছরের এক সময় হাতে লেখা বই বিক্রি করা হতো। এরপর জোহানেস গুটেনবার্গ চলতি অক্ষরের মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের পর ইউরোপে প্রিন্টিং বিপ্লবের সূচনা করে। এরপর ১৪৬২ সালে পুরোদমে প্রতিষ্ঠিত হয় ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা।

বইমেলার উৎপত্তি

বাম পাশে- ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা/ ডান পাশে- লন্ডন বইমেলা

এরপর, আরও চালুহয় জার্মানির লিপজিগ বইমেলা, তারপর বিশ্ব জুড়ে শুরু হয় বিভিন্ন দেশে বইমেলা। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় বইমেলা গুলো হল আবুধাবি আন্তর্জাতিক বইমেলা, ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা, বুকএক্সপো আমেরিকা, গুয়াদালাজারা আন্তর্জাতিক বইমেলা, হংকং বইমেলা, লন্ডন বই মেলা, নয়াদিল্লি বিশ্ব বই মেলা, কলকাতা বইমেলা ইত্যাদি।

বাংলাদেশের বইমেলার ইতিহাস

একুশে বইমেলা আর বাংলাদেশের প্রথম বইমেলার ইতিহাস দুইটির মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে। যদি প্রশ্ন ওঠে বাংলাদেশের প্রথম বইমেলা কবে হয়েছিল? তবে বলা যায় ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশের প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবং, এটি প্রয়াত কথাসাহিত্যিক ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদদীনের উদ্যোগে একটি শিশু গ্রন্থমেলা হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের নীচতলায়। আর, এটিই ছিল তৎকালীন (পূর্ব পাকিস্তান) তথা বাংলাদেশের সর্ব প্রথম বইমেলা।

সরদার জয়েনউদ্দীন তাঁর কর্মজীবনের প্রথমে সেনাবাহিনীর হাবিলদার কেরানি হিসেবে শুরু করেন, এরপর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর চাকরী ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগে যোগ দেন। এরপর, ১৯৫১ সালে দৈনিক সংবাদ পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগের ম্যানেজার, আর তারপর দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন।

১৯৫৫- ৫৬ সালে ‘সেতারা’ ও ‘শাহীন’ নামক পাকিস্তান কোঅপারেটিভ বুক সোসাইটির শিশুকিশোর ম্যাগাজিনের সম্পাদকের কাজ করেন। ওবং শেষে ১৯৬২ সালে তিনি বাংলা একাডেমির সহকারি প্রকাশনা করমকরতা হিসেবে চাকরিতে নিজুক্ত হন।

আর, সেই সময়ই তিনি একটি ইংরেজি বইয়ের শিরনামে ” Wonderful World of Books ” কৌতুহলি হয়ে পড়তে গিয়ে খুঁজে পান ” Book Fair ” শব্দটি। শব্দটি দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হন এবং তিনি সেই সময় বাংলাদেশে বই পাঠকের সংখ্যা বাড়াতে এবং বইয়ের প্রচারনা বাড়াতে বইমেলার গুরুত্ব খুব ভালোভাব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি সেই সময় থেকেই ভাবতে থাকেন কখন একটি বইমেলার আয়োজন করা যায়।

এরই মধ্যে তিনি ১৯৬৪ সালে ন্যাশনাল বুক সেন্টারে (বর্তমান জাতিয় গ্রন্থকেন্দ্র) একজন গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান ও পরবর্তীতে পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময় ইউনেস্কোর শিশুসাহিত্য বিষয়ক উপকরণ সংগ্রহের কাজ করেছিলেন। এবং তাঁর সংগৃহীত শিশু সাহিত্যের প্রদর্শনীর লক্ষেই তিনি ১৯৬৫ সালে সেন্ট্রাল পাবলিক লাইব্রেরীতে শিশুগ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। আর, এই ভাবেই বাংলাদেশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয়।

বাংলাদেশের বইমেলার ইতিহাস

আর, তারপরই তিনি থেমে থাকেননি, ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে একটি বইমেলার আয়োজন করেন ও সেখানে সভার ও আয়োজন করা হয়। সেই সভায় বক্তব্য রাখেন তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল হাই, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম।

সে সব আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল হাই, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম। মেলাকে আরও আকর্ষণীয় ও জনসাধারণের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছানোর জন্য মেলার মাঠে একটি গরুকে বেঁধে রাখা হয়ছিল এবং তার গায়ে লেখা হয়েছিল ” আমি বই পড়ি না ”

এরপর, ১৯৭২ সালে ইউনেস্কো সালটিকে আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ ঘোষণা করলে সেই বছর ডিসেম্বরে ২০-২৫ তারিখ পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। আর, এটিই ছিল বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক গ্রন্থমেলার সূচনা ও বলা যায় বাংলাদেশের বইমেলার ইতিহাস। আর, এই ১৯৭২ সালেই শুরু হয়েছিল একুশে বইমেলা অর্থাৎ একুশে বইমেলার ইতিহাস। যাওয়া যাক সেখানে।

একুশে বইমেলার ইতিহাস

একুশে বইমেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের মতই পুরনো। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক বই মেলার সূচনার আগে ৮ ফেব্রুয়ারী তারিখে কলকাতা থেকে আনা তৎকালীন চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত ” স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ ” থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকদের লেখা ৩২টি বই নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ধমান হাউস (বর্তমান বাংলা একাডেমি) প্রাঙ্গনে এক টুকরো চটের ওপর সাজিয়ে গোড়াপত্তন করেন আজকের একুশে বইমেলার। একুশে বইমেলার ইতিহাস শুরু সেখান থেকেই।

ঐ ৩২ টি বই হল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান। এমনকি তিনি তাঁর এই ধারা ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত একাই বলবৎ রেখেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর এই অক্ষয় মনবলে অনুপ্রানিত হয়ে এবং ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণে আরও অনেকে অনুপ্রাণিত হন এবং আরও বিভিন্ন প্রকাশনী বইমেলায় অংশ গ্রহন করেন।

একুশে বইমেলার ইতিহাস

এরপর, ১৯৭৯ সালে চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক” সমিতি গঠন ও প্রতিষ্ঠা করেন। আর, তখনও ফেব্রুয়ারী মাসের এই বইমেলা কে “অমর একুশে বইমেলা” বলা হয়নি। তৎকালীন ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মাওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন।

এবং তাঁর হাত ধরেই সে বছর আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলা একাডেমিতে প্রথম ” আয়োজন সম্পন্ন করেন। তবে তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষা ভবনের সামনে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে শিক্ষার্থীদের গায়ের ওপর ট্রাক চাপা দেয়া হলে সেখানে মৃত্যু হয় দুইজন ছাত্রের।

তাই, সেই বছরও অমর একুশে মেলা সম্পন্ন করা হয়নি; তারপর ১৯৮৪ সাল থেকে বেশ জাঁকজমক ভাবে অনুষ্ঠিত হয় ” অমর একুশে বইমেলা। তো এই ছিল অমর একুশে বইমেলার ইতিহাস।

একুশে বইমেলার বর্তমান

ওপরের অংশে একুশে বইমেলার ইতিহাস জানার পর, এখন সময় হয়েছে একুশে বইমেলার বর্তমান অবস্থা জানার। আর এটি একটি গর্বের বিষয় যে মাত্র ৩২টি বই নিয়ে চটের টুকরায় বসে একজন প্রকাশকের উদ্যোগে যে বইমেলার গোড়াপত্তন হয়েছে, সেই মেলায় পরবর্তী সময়ে ২০০২ সালে ২৪০ জন প্রকাশক এবং ২০১২ সালে সালে সর্বোচ্চ ৪২৫ জন প্রকাশক অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহন করেন।

এবং ২০১৪ সালে মেলার দর্শনার্থী সংখ্যা বাড়ার কারণে মেলা বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গন থেকে সম্প্রসারিত করা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এবং, ২৯৯ জন প্রকাশকের মধ্যে ২৩২ জন প্রকাশককে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়।

বর্তমান সময়ে এটি শুধু একটি গ্রন্থ মেলা নয়; একুশে বইমেলা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দলনের ঐতিহ্য বহন করে। এবং এটি দেশের একটি জাতীয় পর্যায়ের মেলা এবং ভাষা-আন্দলনের পটভূমি এই বইমেলাকে আরও বেশি মহিমান্বিত করে। মেলায় প্রত্যেক বছর বাড়ছে দর্শনার্থী, পাঠক, এমনকি  আন্তর্জাতিক দর্শকেরও ভালোই দেখা মেলে।

যদি এইভাবে একুশে বইমেলার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে, তবে আশা করা যায় এটি এর ঐতিহ্য ধরে রাখবে অনন্তকাল ধরে যতদিন এই পৃথিবীতে বাংলাদেশ থাকবে।

আশাকরি, যারা এতদুর পর্যন্ত নিবন্ধ পড়েছেন, তাঁদের ভালো লেগেছে। আপনার যদি এমন আরও নিবন্ধও পড়তে ভালো লাগে, তবে আপনি আরও পড়তে পারেন “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলা সাহিত্য“।

Leave a Reply

Your email address will not be published.