September 26, 2022
হাজার বছর ধরে-জহির রায়হান বই রিভিউ

হাজার বছর ধরে-জহির রায়হান বই রিভিউ

হাজার বছর ধরে-জহির রায়হান বই রিভিউ হল আজকের নিবন্ধের মূল বিষয়। ” হাজার বছর ধরে ” একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উপন্যাস। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান লিখেছেন এই উপন্যাসটি। উপন্যাসটি পড়ার পর যে বিষয়গুলো লক্ষ্য করা যায়, তার সম্বন্ধে আলোচনা ও সমালোচনা করায় এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। আশা করি, শেষ পর্যন্ত নিবন্ধটি পড়বেন।

নিবন্ধটির মূল আলচনায় আসতে গেলে প্রথমেই আগে উপন্যাসটির একটা ছোট সাড় সংক্ষেপ দিয়ে শুরু করা দরকার। তাহলে আলোচনাটি সহজ হয়ে যাবে। তো শুরু করা যাক, উপন্যাসঃ হাজার বছর ধরে-জহির রায়হান বই রিভিউ।

হাজার বছর ধরে-জহির রায়হান বই রিভিউ

তো প্রথমেই শুরু করবো উপন্যাসটির দৃশ্যপটের উৎপত্তি থেকে। তা না হলে সারমর্মে আশা যাবে না, মূলত এত বড় বর্ণনাটি হয়তো ভাব- সম্প্রসারণ মনে হবে। তাই শুরু করলাম, কিছু পারিপার্শ্বিক ও সার্বিক দৃশ্যপট থেকে উপন্যাসটির পর্যালোচনা।

হাজার হাজার বছর ধরে বয়ে চলেছে নদী, বয়ে চলেছে জোয়ার-ভাটার খেলা, বয়ে চলেছে সেই নদীতে নৌকা আর মাঝির জীবন। বয়ে চলেছে নদীর পাড়ে পাড়ে ছোট ছোট গ্রাম। সেইসব ছোট ছোট গ্রামের শত শত ছোট ছোট সমাজ, তারাও বয়ে চলছে কল কল কিংবা হতাশ হয়ে কূল- কূল করে। আর, সেই সব ছোট ছোট গ্রাম্য সমাজে চলছে হাজার বছর ধরে হাজার হাজার ঘটনার আলো- আঁধারির খেলা।

আর, তার মধ্যে যখন একই সাথে আশা-নিরাশা , প্রেম-ভালোবাসা, চাওয়া-পাওয়ার হাজার বছরের খেলা চলে, তা সহজে চোখে পরেনা সেখানে চলতে থাকা আলো- আঁধারির খেলায়।

সেখানে আবার পুরুষরা শুধু মানুষ! নারীর জন্ম হয় শুধু পুরুষ মানুষের দাসী হওয়ার জন্য। আর, নারীরা মানুষ না হওয়ার দরুন তাদের অধিকার সম্বন্ধে কোন প্রশঙ্গই নেই। নারীরা তাই পুরুষের হাতের পুতুল, যেভাবে নাচানো হয় ঠিক সেই রকমই হয় তাদের জীবন। আর, পুরুষদের এই মূর্খতায় সমাজে নেমে আসে অন্ধকার; আর সেই অন্ধকারে জন্ম হয় কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ আর নারী নিপীড়ন-নিষ্পেষণ-নির্যাতনের মতো ভয়ানক অপরাধের। অথচ, সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন অপরাধগুলো সেখানে স্বাভাবিক বৃত্তি।

আর এমন এক তিন-চার ঘরের ছোট অন্ধকার সমাজের চিত্র, চলচ্চিত্রিত উপন্যাস হয়েছে জহির রায়হানের “হাজার বছর ধরে” উপন্যাসে।

হাজার বছর ধরে-জহির রায়হান উপন্যাসের সারমর্ম

দীঘির নাম ” পরীর দীঘি “। দিঘিটীর নাম কীভাবে পরির দীঘি হল তা জানা যায় না। তার পাশেই ৩-৪ ঘরের একটা পাড়া বা গ্রাম। সেখানেই শুরু হয়েছে কাহিনীটি। কখন গোড়াপত্তন হয়েছিল গ্রামটির, তা জানা না গেলেও জানা যায় এক বন্যায় “কাশেম শিকদার” আর তার স্ত্রী “ছমিরন বিবি” বানের পানিতে ভেলায় ভাসতে ভাসতে এসে ঠাঁই নিয়েছিল সেই জায়গায়। আর তার পরেই সেখানেই গোড়াপত্তন হয়েছিল শিকদার বাড়ির।

শিকদার বাড়িতে বাস করে বৃদ্ধ “মকবুল” ও তার তিন স্ত্রী সহ “আবুল” , “রশিদ” , “ফকিরের মা” ও “মন্তু” এবং আরও বেশ কয়েকজন। বৃদ্ধ মকবুলের ৩য় স্ত্রী, ১৪ বছর বয়সী কিশোরী টুনি। টুনির প্রাণোচ্ছল কিশোরী মন বৃদ্ধ মকবুলের কোন শাসন মানতে চায় না। তাই, তার সঙ্গি হিসেবে সে বেছে নেয় তার প্রায় সমবয়সী সুঠামদেহী কিশোর মন্তুকে। মন্তু একজন অনাথ, সে মকবুলের দুঃসম্পর্কের ভাই। অনাথ হওয়ায় ঠাই হয়েছে বুড়ো মকবুলের বাড়িতে।

সে বিভিন্ন কাজ করে জীবন চালায়। টুনি আর মন্তু সকলের অগোচরে রাতের বেলা মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়ে। আবার, কখনও বা বর্ষায় বেরিয়ে পড়ে শাপলা তুলতে। এমনি করে দুজনের কাছে এসে যায় দু’জনা। কিন্তু, সেই সামাজিক ভয়ে কেও কাউকে কিছু বলতে পাড়ে না আর সমাজের ধারালো নখর আছড়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে তাঁদের ওপর।

আর, টুনি- মন্তুর এইসবের আসে পাশে আরও ঘটে যায় বিভিন্ন রকম ঘটনা, সেখানে পিটিয়ে পিটিয়ে স্ত্রী হত্যার মতো ঘটনাও ঘটে। আরও ঘটে বিভিন্ন রকমের ঘটনার প্রবাহ, যা ঐ সমাজের একটা সার্বিক চিত্র তুলে ধরে। এর পড়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সেই সমাজে হঠাৎ এসে পড়ে, কলেরা মহামারি।

কলেরা বসন্তের তোপে উজাড় হয়ে যেতে থাকে কয়েক ঘরে মানুষগুলো। আর তাঁরা ডাক্তার না দেখিয়ে, টুকটাক তাবিয- কবজ করে সেখানকার মানুষ। হঠাৎ, এর মাঝে আকস্মিক মৃত্যু হয় মকবুল বুড়োর; আর সেই সুযোগে মন্তু যখন টুনিকে বলে তার ভালোবাসার কথা। কিন্তু, ততক্ষনে, বেশ দেড়ি হয়ে যায় মন্তু আর টুনির ভাব প্রকাশে। ততক্ষনে মৃত্যু হয় গনু মোল্লা, আম্বিয়া, রশিদ, ফকিরের মা,  সালেহা কেউই বেঁচে থাকে না।

টুনির জীবন চলতে থাকে মকবুলের বিধবা হয়ে মনের ভেতর একটা সুপ্ত ব্যথা নিয়ে। মন্তু চলে যায় দূরে, তাদের আর আগের মতো দেখা হতো না। অনেকটা সময় পাড় হয়ে যায়। হঠাৎ, এক রাতে সুরত আলির ছেলে পুঁথিপাঠের আসর জমায়। সে তার বাবার মতই সুন্দর পুঁথি পাঠ করে। সে ভেলুয়া সুন্দরীর পুঁথিপাঠ শুরু করে- “শোন শোন বন্ধুগনে শোন দিয়া মন, ভেলুয়ার কথা কিছু শান সর্বজন।”

আর, সেই একই তালে, একই সুরে পুঁথিপাঠের মতো হাজার হাজার বছর ধরে ভালোবাসার বিয়োগান্ত নাটক চলে আসছে আমাদের এই গ্রামীণ- হাজার বছরের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে। আর, ভয়ানক ভাবে কালের বিবর্তনে সব পাল্টালেও, পাল্টে না বাংলার গ্রামের অন্ধকার।

আর, এই চিত্রপট এখনও দেখা যায় বাংলার বিভিন্ন গ্রামে। তো এই ছিল মূলত হাজার বছর ধরে-জহির রায়হান উপন্যাসের পাঠ পরবর্তী পর্যালোচনা। আশ করি, আপনাদের ভালো লেগেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.