May 24, 2022
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ একজন অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলা আধুনিক সাহিত্যের একটি নতুন ধারার জনক। এবং, তিনি তাঁর লেখায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়বস্তু নিয়ে লেখালেখি করেছেন। তিনি উপন্যাস, কল্প-উপন্যাস এবং বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীও লেখেছেন। আরও লিখেছেন শিশু-কিশোর ও আত্মজৈবনিক গ্রন্থ। বানিয়েছেন নিজস্ব উপন্যাসের ওপর চলচ্চিত্র ও নাটক; আর সেগুলোও সমাদৃত হয়েছে সাধারণ বাঙ্গালির অন্তরে।

আজ আমরা আরও বিশদভাবে জানবো, বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে। আলোচনা এবং সমালোচনা করবো তাঁর দেয়া সাহিত্যের উপাদানগুলো নিয়ে। আজকের এই নিবন্ধটি উৎসর্গ করা হলো আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদকে। আর তিনি শুধু লেখকই নন বরং তিনি জহির রায়হানের মতো একজন চলচ্চিত্রিত ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা-পরিচালকও বটে।

হুমায়ূন আহমেদ- এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নেত্রকোণা মহকুমার মোহনগঞ্জে হুমায়ূন আহমেদ জন্মগ্রহন করেন। তিনি জন্মগ্রহন করেন তাঁর নানা বাড়িতে। হুমায়ূন আহমেদের পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমদ এবং তাঁর মার নাম আয়েশা ফয়েজ। হুমায়ূন আহমেদের মা ছিলেন একজন গৃহিণী এবং বাবা ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমার উপ-বিভাগীয় পুলিশ অফিসার ছিলেন এবং তিনি কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন। হুমায়ূন আহমেদের বাবা ফয়জুর রহমান আহমদও একজন সাহিত্যনুরাগী ছিলেন। তিনি বগুড়াতে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন পত্র- পত্রিকায় লেখালেখি করতেন; এমনকি বগুড়ায় থাকার সময় তিনি একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেছিলেন, যার নাম ” দ্বীপ নেভা যার ঘরে “।

জীবন যে রকম আয়েশা ফয়েজ

জীবন যে রকম- আয়েশা ফয়েজ লিখিত আত্মজীবনী।

আর, অপরদিকে হুমায়ূন আহমেদের মায়ের লেখালেখি করার অভ্যাস না থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর শেষজীবনে একটি আত্মজীবনী গ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম ” জীবন যে রকম “। হুমায়ূন আহমেদের অনুজ হলেন আমাদের প্রিয় অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, এবং সর্ব কনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব দুইজনই বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। হুমায়ূন আহমেদের তিন বোন হলেন সুফিয়া হায়দার, মমতাজ শহিদ, ও রোকসানা আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদ রচিত আত্মজীবনী ও তাঁর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়; ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদ এর নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান তাঁর বাবার নামের সাথে মিল রেখে; এরপরেই তিনি একসময় নিজেই তাঁর ছেলের নাম পরিবর্তন করে নাম রাখেন হুমায়ূন আহমেদ। এমনকি তারা চট্টগ্রাম থাকাকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম ছিল বাচ্চু। হুমায়ূন আহমেদ তার মামা ফজলুল করিমের কাছ থেকে শিখেছিলেন ছবি আঁকা।

হুমায়ূন আহমেদ এর শিক্ষাজীবনঃ 

হুমায়ূন আহমেদের শিক্ষাজীবন বেশ বিচিত্র ছিল। তাঁর বাবার চাকরী সুত্রে তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গাই থেকেছেন; হুমায়ূন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে লেখাপড়া করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার শুরু হয় সিলেটের কিশোরী মোহন পাঠশালায় ১৯৫৫ সালে। সেখান থেকে তিনি ১৯৫৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষার শেষ করেন। এরপর তাঁর বাবার বদলির কারণে চলে আসতে হয় বগুড়ায়।

এরপর, হুমায়ূন আহমেদ ১৯৬৩ সালে তিনি বগুড়া জেলা স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ১৯৬৫ সালে সেখান থেকে মেট্রিক পাশ করেন এবং সেই বছর তিনি রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এরপরে, ঢাকা কলেজ থেক বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন সাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে প্রথম শ্রেণীতে তিনি বি এস সি ( সম্মান) ও এম এস সি ডিগ্রি অর্জন করেন।

আর, আরেকটি চমকপ্রদ বিষয় হল, ৫৬৪ নং কক্ষে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্রজীবন অতিবাহিত করেন এবং অবস্থানকালীন সময়েই তিনি তাঁর জীবনের প্রথম উপন্যাস “নন্দিত নরকে” লেখেন এবং তা প্রকাশ করেন।

নন্দিত নরকে- হুমায়ূন আহমেদের লেখা প্রথম উপন্যাস

নন্দিত নরকে- হুমায়ূন আহমেদের লেখা প্রথম উপন্যাস

হুমায়ূন আহমেদের দাম্পত্য জীবনঃ

হুমায়ূন আহমেদের প্রথম জীবনে তিনি বিয়ে করেন তাঁর একজন ভক্ত পাঠককে। নাম তাঁর গুলতেকিন খান; তিনি তৎকালীন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক ইবরাহীম খাঁ– র নাতনী।

হুমায়ূন আহমেদ ও গুলতেকিন খান এর বিয়ে হয় ১৯৭৩ সালে। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে জন্ম হয় তিন মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের। তাঁদের বড় মেয়ে নোভা আহমেদ, শিলা আহমেদ মেজ মেয়ে, সবার ছোট বিপাশা আহমেদ আর তারপর  তাঁদের বড় ছেলে নুহাশ হুমায়ূন।

হুমায়ূন আহমেদ ও গুলতেকিন খান আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ ও গুলতেকিন খান আহমেদ ও নুহাশ হুমায়ূন

এরপর, ১৯৯০ সালের দিকে বেশ কিছু নাটক- চলচ্চিত্র অভিনয়ের সময় শিলা আহমেদের বান্ধবী মেহের আফরোজ শাওনের সাথে ঘনিষ্ঠতা জন্মে; এই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে জন্ম নেয়া দাম্পত্য কলহের জেরে ২০০৫ সালের দিকে গুলতেকিনের সঙ্গে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ ও সেই বছরই বিয়ে হয় তাঁদের। এই দাম্পত্য জীবনে তাঁদের প্রথম কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হাবার পরই মারা যায়। তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘লীলাবতী’। তার স্মরনে নুহাশ পল্লিতে একটি জলাধারের নাম রাখা হয় ” লীলাবতী “। এরপর শাওনের ঔরসজাত আরও দুটি ছেলে সন্তান হয়; তাঁদের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন।

হুমায়ূন আহমেদ ও মেহের আফরোজ শাওন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ ও মেহের আফরোজ শাওন আহমেদ

তো এই ছিল হুমায়ুন আহমেদের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু কথা। এইবার চলে আসবো এই নিবন্ধের মূল বিষয়বস্তুতে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের অবদান নিয়ে কথা বলব।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ একজন ধূমকেতু, কিংবা উল্কাপিণ্ড! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারার বিকাশ করেছেন তাঁর নান্দনিক লেখার ধারা দিয়ে। তাঁর লেখা উপন্যাস, ছোটগল্প,  নাটক, চলচ্চিত্রগুলো ছুঁয়ে গেছে প্রত্যেক সাধারণ মানুষের মন। এখনও ছুঁয়ে আছে সাধারণ পাঠকেদের মন। তাঁর লেখা সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিজ উপন্যাস হল হিমু ও মিসির আলি। আর; তারপরেই আছে শুভ্র। হুমায়ূন আহমেদের মস্তিষ্কে আবিষ্কৃত এই তিনটি ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করেই তিনি অসংখ্য গল্প কাহিনী লেখেছেন।

আর, সেই চরিত্রগুলোর সত্তার তীব্রতা গামা রশ্মির মতো ভেদ করেছিল বেশির ভাগ পাঠকদের হৃদয়। কেও ভবঘুরে, কেও অনুসন্ধানী, কেও আবার শুদ্ধতম মানুষ। এইসব ব্যক্তিত্বগুলো বাংলাসাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ কে চিরঞ্জীব করে রাখবে। আর, তারপরেই চলে আসে হুমায়ূন আহমেদের লেখা ও পরিচালনায় নির্মিত নাটক, টেলিফিল্ম আর চলচ্চিত্র। হুমায়ুন আহমেদ এর প্রথম নির্মিত চলচ্চিত্র হল আগুনের পরশমণি

হুমায়ন আহমেদের কালজয়ী কিছু সিনেমার পোস্টার

হুমায়ন আহমেদের কালজয়ী কিছু সিনেমার পোস্টার

আগুনের পরশমণি চলচ্চিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকে ঘিরে। চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় পুরস্কার সহ আরও ৮টি চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে। এছাড়াও তাঁর নির্মিত শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), দুই দুয়ারী (২০০০), শ্যামল ছায়া (২০০৪), ও ঘেটু পুত্র কমলা (২০১২) অন্যতম। এদের মধ্যে শ্যামল ছায়া ও ঘেঁটু পুত্র কমলা পরিচালনার জন্য হুমায়ূন আহমেদ শ্রেষ্ঠ পরিচালনা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

চলচ্চিত্রগুলো বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদকে অবিস্মরণীয় করে রাখবে। তাছাড়া আরও রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের লেখা ও পরিচালনা করা নাটক। হুমায়ূন আহমেদের লেখা সর্বপ্রথম টেলিভিশন নাটক হল ” প্রথম প্রহর ” ১৯৮৩ সালে নাটকটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়। হুমায়ুন আহমেদের প্রথম টেলিভিশন নাটক ” প্রথম প্রহর ” পরিচালনা করেন নওয়াজিশ আলি খান।

এরপর হুমায়ূন আহমেদ এর চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় প্রথম ধারাবাহিক নাটক হল ” আজ রবিবার “। এটি একটি ১৩ পর্বের ধারাবাহিক নাটক, যা ১৯৯৯ সালে প্রথম বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয় এবং বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। এর পরে এই নাটকটি ২০১৭ সালে হিন্দি ভাষায় ভারতীয় স্যাটেলাইট টেলিভিশন স্টার প্লাস-এ পুনরায় সম্প্রচারিত হয়। তাঁর লেখা আরও বেশ কিছু ধারাবাহিক নাটক হল; এই সব দিনরাত্রি, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত, অয়োময়, আজ রবিবার, সবুজ সাথী, উড়ে যায় বকপক্ষী ইত্যাদি। এগুলোর প্রত্যেকটি খুব জনপ্রিয় নাটক।

হুমায়ূন আহমেদের লেখনী, চলচ্চিত্রে ও নাটকে ফুটে উঠেছে, বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক- অস্বাভাবিক এমনকি অসাধারণ চিত্রও ফুটে উঠেছে। তাঁর চলচ্চিত্র, নাটক, গল্প ও উপন্যাসে তিনি যে ভাষায় চরিত্রগুলোর সংলাপ ব্যাক্ত করেছেন তা অত্যন্ত সরল এবং তাতে কোন কিছু যেন অস্পষ্ট নেই। সব কিছুই স্পষ্ট এবং সেই স্পষ্টতাই আকর্ষণ করে বেশিরভাগ দর্শককে। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সাহিত্য যুগকে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন যুগও বলা হয়।

বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের প্রভাব

বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের প্রভাব সুদুরপ্রসারী। আর এক্ষেত্রে বলা যায় সময়ের বেশির ভাগ পাঠক আর যুবক লেখক যারা আছে, তাঁরা প্রত্যকেই যেন চেষ্টা করে হুমায়ূন আহমেদের লেখার ধারা বাংলা সাহিত্যে ধরে রাখতে। যার ফলে তাঁদের সাহিত্যে নতুনত্ত খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

আর, এই কারণে অনেক খানি দিন দিন নতুনত্তে অলসতার কারণে ব্লাকহ্যোলের মুখে বাংলা সাহিত্য। যা , হয়তো একদিন এই কিংবদন্তী সাহিত্যিককেও অবমুল্যায়িত করবে। তহ এই ছিল আজকের নিবন্ধ। আশা করি সবার ভালো লেগেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.