September 29, 2022
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস হল দুর্গেশনন্দিনী। অন্যান্য, সাহিত্যের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের বেশ নতুন একটি সংযোজন। উনিশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের উদ্ভবের পর ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- এর দ্বিতীয় উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী। যাকে পরবর্তীতে আমরা বলছি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস।

এই আর্টিকেল বা নিবন্ধটিতে আমারা আজ দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবো। এবং তার সাথে আমরা আরও আলোচনা করবো বাংলা উপন্যাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে।

বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের আগমন

উপন্যাস শব্দটি এসেছে  উপনয় বা উপন্যস্ত শব্দ থেকে। এবং এটি ইংরেজি ভাষার novel শব্দটির বাংলা পরিভাষারূপে গৃহীত। উপন্যাসের পূর্বে বাংলা ভাষায় মহাকাব্যের প্রচলন ছিল। এবং সেই সব মহাকাব্যেও প্রথম উপন্যাস এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সংস্কৃতে লেখা মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত, দশকুমারচরিত, বৃহৎকথা, কথাসরিৎসাগর, বেতালপঞ্চবিংশতি, কাদম্বরী এবং পালি ভাষায় রচিত জাতককাহিনীতেও উপন্যাসের বিভিন্ন উপাদান পাওয়া যায়।

তাছাড়াও, বাংলা ভাষায় রচিত মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল ও বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য সর্বাংশে লক্ষণীয়। তারপর, ১৮৫৭ সালে বাংলাভাষার প্রথম উপন্যাস আলালের ঘরের দুলাল মুদ্রণ ও প্রকাশ করা হয়। এক্ষেত্রে প্যারীচাঁদ মিত্র তাঁর ছদ্মনাম টেকচাঁদ ঠাকুর নামে বইটি প্রকাশ করেন। সেখানে ব্যঙ্গাত্নক উপস্থাপনার মাধ্যমে তৎকালীন কলকাতার উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনাচরণ তুলে ধরেছেন। তবে, সেক্ষেত্রে তিনি চলিত ভাষা ব্যাবহার করেছেন।

আর তারপর; উপন্যাসের বিশেষ কিছু বিষয় উপাদান অবিদ্যমান থাকায় এটি পুরপুরি সার্থক হয়ে উঠেনি। তবে ‘আলালের ঘরের দুলাল ‘ উপন্যাসটিকে বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস ধরা হয়। এরপর ১৮৬৫ সালে যখন বঙ্কিমচন্দ্র চাট্টোপাধ্যায় -এর প্রথম বাংলা উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী প্রকাশিত হয়। তারপর এটিকে ধরা হয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৮৩৮ সালের ২৬ জুন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার নৈহাটি শহরের পাশে কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। দিনটি ছিল বাংলা ১৩ আষাঢ় ১২৪৫ বঙ্গাব্দ। বঙ্কিমচন্দ্রের আদিনিবাস হুগলি জেলার দেশমুখো গ্রামে। তিনি তাঁর জন্মের ৬ বছর পর্যন্ত কাঁঠালপাড়াতেই বসবাস করেন; এবং তিনি ৫ বছর বয়সে কুল-পুরোহিত বিশ্বম্ভর ভট্টাচার্যের কাছ থেকে  তাঁর হাতে খড়ি শেখেন।

এরপর, তিনি তাঁর বাবার কর্মস্থল মেদিনীপুরে আনিত হন; এবং মেদিনীপুরের ইংরেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পরামর্শে বাবা যাদবচন্দ্র তাকে সেখানে ভর্তি করান এবং সেখানে তিনি ইংরেজি শিখেন। এরপর তিনি আবার ১৮৪৯ সালে কাঁঠালপাড়ায় ফিরে আসেন, এবং সেখানে শ্রীরাম ন্যায়বাগীশের কাছে বঙ্কিম বাংলা ও সংস্কৃতের পাঠ নেন।  সে সময় তিনি ভালো আবৃত্তিও করতে পারতেন।  এরপর ১৮৪৯ সালে, কিছুকাল পরেই তিনি হুগলী কলেজে ভর্তি হন এবং ৭ বছর  সেখানেই পড়াশোনা করেন।

তারপর, তিনি ১৮৫৬ সালে হুগলী কলেজের পড়াশোনা শেষে কলকাতায়  প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন আইন পড়ার জন্য। তারপর সেখান থেকে, ১৮৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে সেখান থেকে ১৮৫৮ সালে প্রথমবারের মতো বি.এ. পরীক্ষা নেওয়া হলে বঙ্কিমচন্দ্র ও যদুনাথ বসু উত্তীর্ণ হন। তারপর সরকারি চাকরীতে নিযুক্ত হন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্‌টার পদে এবং নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন ১৮৯১, ১৪ সেপ্টেম্বর অবসর তারিখ অব্দি।

তাঁর চাকরী জীবনের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য চর্চা করেন এবং এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী

দুর্গেশনন্দিনী সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- এর প্রথম বাংলা উপন্যাস। এবং এটিই হল বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস। দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসটি রচনা করা হয়; পনের শতকের শেষভাগে উড়িষ্যার অধিকারকে কেন্দ্র করে মোঘল ও পাঠানের সংঘর্ষের পটভূমির ভিত্তিতে। এবং এটিকে সম্পূর্ণ রূপে ঐতিহাসিক উপন্যাস না ধরে মুলত একটি রোমান্সধর্মী উপন্যাস ধরা হয়।

আবার, কোনো কোনো সাহিত্য সমালোচকরা এই উপন্যাস এ স্যার ওয়াল্টার স্কটের “আইভানহো” উপন্যাসের ছায়া লক্ষ্য করেছেন। তবে তা বহুল প্রমানিত নয়। বঙ্কিমের জীবদ্দশায় দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের ১৩ টি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং অন্যান্য ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষা সহ ইংরেজিতে অনুদিত হয়।

দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের মুল আখ্যান

বিষ্ণুপুর থেকে মান্দারণ যাত্রাকালে মোঘল সেনাপতি অম্বররাজ মানসিংহের পুত্র কুমার জগৎসিংহ ঝরের কবলে পরে পাশের একটি শৈলেশ্বর মহাদেবের মন্দিরে আশ্রয় নেয়। ঘটনাচক্রে সেখানে আরও সাক্ষাৎ হয় মান্দারণ দুর্গের অধিপতি জয়ধর সিংহের পুত্র মহারাজ বীরেন্দ্র  সিংহের স্ত্রী বিমলা ও তাঁর কন্যা দুর্গেশনন্দিনী তিলেত্তমার সাথে। সেখানে একে ওপরের পরিচয় গোপন রাখলেও জগৎসিংহ ও তিলোত্তমা পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

এরপর; মান্দারণ দুর্গ সুকৌশলে অধিকার করে পাঠান সেনাপতি ওসমান খাঁ এবং বীরেন্দ্র সিংহ , তাঁর স্ত্রী ও কন্যাকে অর্থাৎ তিলেত্তমাকে বন্দি করা হয়; সাথে কুমার জগৎসিংহ কেও বন্দি করা হয়। এরপর; পাথান নবাব কতলু খাঁর প্রহসনের ন্যায় বিচারে বীরেন্দ্র সিংহকে হত্যা করা হয়। এরপর; পাঠান নবাব কতলু খাঁকে হত্যা করে বীরেন্দ্র সিংহের স্ত্রী বিমলা পতি হত্যার প্রতিশোধ নেন।

তারপর; কুমার জগৎসিংহের মাধ্যমে দিল্লীশ্বরের সঙ্গে সন্ধি করেন পাঠানেরা। তারপর জগৎসিংহের এই মহত্নে মুগ্ধ প্রেমে পরেন কতলু খাঁর কন্যা নবাবজাদী আয়েষা। একথা পাঠান সেনাপতি ওসমান জানার পর ক্রোধে কুমার জগৎ সিংহের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করেন। তারপরও; সর্বশেষে মান্দারণ পুনরায় স্বাধীন হয় এবং প্রধান মোঘল সেনাপতি অম্বররাজ মানসিংহের সহযোগিতায় মহারানী বিমলার হাতে রাজ্জপাঠ হস্তান্তরিত করা হয়। মহাধুমধামে দুর্গেশনন্দিনী তিলোত্তমার সাথে মিলন ঘটে কুমার জগৎ সিংহের।

দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাস সম্মন্ধে

” দুর্গেশনন্দিনী ” এই রোমান্সধর্মী উপন্যাস হয়ে ওঠে পরবর্তী ঔপন্যাসিকগণের কাছে একটি মাইলফলক সরূপ। দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাস রচনার ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা করা হয়; ১৮৬২ সালে চব্বিশ বছর বয়সে বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাসটি রচনা শুরু করেন। এবং ১৮৬৩ সালে খুলনায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদে চাকরীকালীন সময়ে তিনি শেষ করেন তাঁর দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসটি। তথ্যটি পাওয়া যায় তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে।

তো, এই ছিল আর্টিকেলটির শেষ অংশটি। পুরো আর্টিকেল জুড়ে চেষ্টা করেছি; যতটা সম্ভব সহজ করে দুর্গেশনন্দিনী; অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস নিয়ে আপনাদের সল্প-সময় সাপেক্ষ তথ্য দিতে। আশা করি আপনাদের ভালো লেগেছে। এমন আরও বাংলা আর্টিকেল পড়তে আমাদের ওয়েবসাইট- এ আরও দেখতে পারেন পথের পাঁচালী-বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published.